ডায়াবেটিস কি এবং কেন হয়? ডায়াবেটিস হলে কি করা উচিৎ

ডায়াবেটিস কি এবং কেন হয়? ডায়াবেটিস হলে কি করা উচিৎ। What is diabetes and why? What to do if you have diabetes.

ডায়াবেটিস এমন এক ধরনের রোগ যা কখনোই নির্মূল হয় না।তবে এটি নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব। আগে ডায়াবেটিস শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে দেখা যেত তবে বর্তমানে এটি সব বয়সীদের মাঝেই দেখা যায়। এর প্রধান কারন হলো ভুল খাদ্যাভ্যাস। শুধুমাত্র ঔষধ খাওয়ার মাধ্যমেই যে এটি নিয়ন্ত্রনে রাখা যায় এটি ভুল ধারনা। ঔষধ খাবার পাশাপাশি দরকার সুষম খাবার খাওয়া। তাহলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব।তাহলে এবার জেনে নেওয়া যাক ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য -

ডায়াবেটিস কি? 
ডায়াবেটিস একধরনের হরমোন সংশ্লিষ্ট রোগ। বাংলাতে যাকে বলে বহুমুত্র রোগ। দেহযন্ত্র অগ্ন্যাশয় যদি যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করতে না পারে অথবা শরীর যদি উৎপন্ন ইনসুলিন ব্যবহারে ব্যর্থ হয়, তাহলে যে রোগ হয় তা হলো 'ডায়াবেটিস' বা 'বহুমূত্র রোগ'। এই রোগের মূল কথা হলো ইনসুলিনের ঘাটতি। 

ডায়াবেটিস রোগ নির্ণয় -
মানুষের রক্তে সাধারনত গ্লুকোজের পরিমান থাকে ৩.৩ থেকে ৬.৯ মিলি.মোল/লি আর খাদ্য গ্রহনের পর তা হয়ে যায় <৭.৮ মিলি.মোল/লি। তবে গ্লুকোজের পরিমান যদি খালি পেটে অর্থাৎ অভুক্ত অবস্থায় থাকে ৭ মিলি.মোল/লি আর খাবার গ্রহনের পর তা যদি গ্লুকোজের পরিমান রক্তে >১১ মিলি.মোল/লি পাওয়া যায় তাহলে বুজতে হবে ডায়াবেটিস আছে। 

ডায়াবেটিস কত প্রকার কি কি? 
ডায়াবেটিস মুলত ২ প্রকার হয়ে থাকে। একটি হলো টাইপ - ১ ডায়াবেটিস এবং অন্যটি হলো টাইপ - ২ ডায়াবেটিস। 
  • টাইপ - ১ঃ যাদের বয়স ২০ বছরের কম বা ২০ বছরের একটু বেশী তাদের মধ্যে  টাইপ - ১ ডায়াবেটিস দেখা যায়। টাইপ -১ ডায়াবেটিসে শরীরে ইনসুলিন তৈরী হয় না।আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন করতে এইসব রোগীকে শরীরে ইনজেকশনের সাহায্যে ইনসুলিন নিতে হয়। অন্যথায় অম্লজাতীয় বিষক্রিয়ায় ব্যক্তি মারাও যেতে পারে।
  • টাইপ - ২ঃ যাদের সুগারে সমস্যা অর্থাৎ ইতিমধ্যে যারা সুগারে আক্রান্ত তাদের বেশীরভাগই টাইপ - ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়।যাদের বয়স ৩০ বছরের বেশী তাদেরই টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয়ে থাকে৷ তবে, বর্তমানে যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে তাদেরও এই টাইপ - ২ ডায়াবেটিস দেখা দিচ্ছে। এই টাইপ - ২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের শরীরে ইনসুলিন তৈরী হয়। অর্থাৎ এরা ইনসুলিনের উপর নির্ভরশীল নয়। নিয়মিত সুষম খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের সাহায্যে এদের চিকিৎসা করা সম্ভব। 

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস -
অনেক সময় দেখা যায় যে, গর্ভকালীন অবস্থায় মেয়েদের ভিতর ডায়াবেটিস ধরা পরে আবার সন্তান প্রসবের পর ডায়াবেটিস আর থাকে না। এই ধরনের ডায়াবেটিসকে বলা হয় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। গর্ভবতী অবস্থায় যদি ডায়াবেটিস হয় তাহলে গর্ভবতী মা ও শিশু উভয়েই ঝুকির মধ্যে থাকে। তবে হ্যা, গর্ভকালীন অবস্থায় ডায়াবেটিস হলে তা এড়ানো জন্য ইনসুলিনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। 

অন্যান্য নির্দিষ্ট কারন ভিত্তিক শ্রেনী -
ক.অনেক সময় দেখা যায় যে জেনেটিক কারনে শরীরে ইনসুলিন তৈরী হয় না।
খ.জেনেটিক কারনে আবার শরীরে ইনসুলিন এর কার্যকরীতা কমে যায়। 
গ.অগ্নাশয়ের বিভিন্ন রোগের কারনে
ঘ.অন্যান্য হরমোনের আধ্যিকের কারনে 
ঙ.ওষুধ ও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শের কারনে। 

ডায়াবেটিস আক্রান্ত হবার কারন সমূহ 
যেকোনো বয়সের যে কেউ যেকোনো সময় ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হতে পারে। তবে যাদের আক্রান্ত হবার সম্ভবনা বেশী থাকে তারা হলো -
ক. যাদের বাবা - মা এর ডায়াবেটিস আছে বা রক্তের সম্পর্ক নিকটাত্মীয় যাদের ডায়াবেটিস আছে। 
খ.যারা শারীরিক পরিশ্রমের কোন কাজ করে না,যাদের ওজম অনেক বেশী ও যারা ব্যায়াম করে না তাদের ডায়াবেটিস হবার সম্ভবনা বেশী থাকে। 
গ.কর্টিসল জাতীয় ওষুধ যারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করেন তাদেরও ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা থাকে।
ঘ.রক্তে কোলেস্টেরেল বেশী থাকে বা যাদের রক্তচাপ আছে। 
ঙ.গর্ভাবস্থায় যেসব মহিলাদের ডায়াবেটিস ছিলো বা যেসব মহিলা ৯ পাউন্ডের বেশী বাচ্চা প্রসব করেছে এমন মহিলাদেরও ডায়াবেটিস আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী।

মাতৃত্বকালীন ডায়াবেটিস কী?
অনেক সময় দেখা যায় যে, গর্ভধারণ এর পর গর্ভবতী মহিলার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। আবার সন্তা প্রসবের পর দেখা যায় রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা আগের মত স্বাভাবিক হয়ে যায়। একেই মাতৃত্বকালীন ডায়াবেটিস বলে। রক্তের গ্লুকোজের পরিমান স্বাভাবিক রাখার জন্য গর্ভাবতী মায়েদের শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী পরিমানে ইনসুলিনের প্রয়োজন হয়। এই ইনসুলিন যদি তৈরিতে শরীর অহ্মম হয় তাহলে গর্ভবতী ওই মায়ের গর্ভাবস্থায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়,অর্থাৎ মাতৃত্বকালীন ডায়াবেটিস হয়। প্লাসেন্টাল হরমোন মাতৃত্বকালীন ডায়াবেটিস এর জন্য দায়ী।

ডায়াবেটিস আক্রান্ত হলে কি ধরনের জটিলতা হতে পারে 
ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হলে ব্যাক্তির শরীরে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। চুলকানী, ফোড়া, চুলকানী, পাতলা পায়খানা, যহ্মা ইত্যাদি। তাছাড়া প্রসাবে আমিষ বের হয়ে যাওয়া, হৃদরোগ, চোখের বিভিন্ন রোগ ও পরবর্তীতে কিডনীর কার্যহ্মমতা হ্রাস পাওয়া। এছাড়াও ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হলে যৌনহ্মমতা কমে যায়। মহিলাদের ক্ষেত্রে বেশি ওজনের শিশু জন্ম, মৃত শিশুর জন্ম, অকালে সন্তান প্রসব, জন্মের পরেই শিশুর মৃত্যু এবং নানা ধরনের জন্মগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে।

ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় করণীয় কি?  
ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় চারটি নিয়ম মেনে চলতে হয়। এই চারটি নিয়ম মেনে চললেও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব। 
ক.খাদ্য ব্যবস্থা অর্থাৎ নিয়মমত সুষম খাদ্য গ্রহন করা 
খ.সাধ্যমত দৈহিক পরিশ্রম করা ও ব্যায়াম করা 
গ.ঠিক মত ওষধ সেবন করা 
ঘ.ডায়াবেটিস সম্পর্কিত বিভিন্ন শিহ্মা

খাদ্য ব্যবস্থা -
যাদের ডায়াবেটিস আছে অথবা যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে এমন ব্যাক্তিদেরকে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম নেমে খাবার খেতে হয়। নিয়ম মেনে খাবার খাওয়ার প্রধান কারন হচ্ছে স্বাস্থ্য ভাল রাখা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখা । 

খাদ্য গ্রহনের নীতি 
যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত সেইসব ব্যাক্তিরা  খাবার খাওয়ার হ্মেত্রে বিশেষ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে, যেমন - 
ক. শরীরের ওজন যদি কম থাকে তা বাড়িয়ে স্বাভাবিক করা বা বেশী থাকলে কমিয়ে ফেলা।আবার ওজন যদি স্বাভাবিক থাকে তাহলে সেইটা ধরে রাখা। 
খ.খাদ্য তালিকা থেকে চিনি, মিস্টি জাতীয় খাবার না খাওয়া। 
গ.যেসকল খাবার আশবহুল সেসকল খাবার বেশী খাওয়া। 
ঘ.যেসকল খাবার শর্করাবহুল সেসকল খাবার হিসাব করে খাওয়া। 
ঙ.আজকে কম,কালকে বেশী খাওয়া এমনভাবে না খাওয়া। 
চ.প্রতিদিন একই সময়ে খাবার খাওয়া 
ছ.কোন বেলার খাবার খাওয়া বাদ না দেওয়া 
জ.যেসকল খাবার ক্যালরিবহুর সে সকল খাবার নির্দেশিত পরিমানে গ্রহন করা।
ঝ.ফ্যাট জাতীয় খাবার কম খাওয়া এবং যেসকল খাবারে ফ্যাট নেই সে সকল খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা। 

সাধ্যমতো কায়িক পরিশ্রম ও ব্যায়াম -
ব্যায়াম ও শরীরচর্চা রোগ নিয়ন্ত্রনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। ব্যায়াম করলে বা দৈহিক পরিশ্রম করলে শরীর সুস্থ থাকে, মাংসপেশীর জড়তা দূর হয় এবং রক্তচলাচলে সাহায্য করে। এর ফলে শরীরের ইনসুলিনের যেই কার্যকারীতা সেইটা বৃদ্ধি পায়। কমপহ্মে প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট করে হাটতে হবে এবং সপ্তাহে যদি ৫ দিন হাটা যায় তাহলে শরীর সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকবে। 

ওষুধ
সব ডায়াবেটিস রোগীকেই খাদ্যের নিয়নকানুন তারপর ব্যায়াম,হাটাহাটি,পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। তবে যারা বয়স্ক রোগী তারা যদি যথাযথ নিয়ম মেনে চলে তাহলে ডায়াবেটিস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তবে যাদের টাইপ - ১ ডায়াবেটিস আছে তাদের ইনসুলিন ইঞ্জেকশন গ্রহন করতেই হই।আর যাদের টাইপ - ২ ডায়াবেটিস তাদের খাবার ওষুধ খেয়ে হয় এবং প্রয়োজন হলে ইনসুলিন ব্যবহার করতে হয়। 

শিক্ষা 
ডায়াবেটিস এই রোগটি নির্মূল করা যায় না। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১/২২৫ নম্বর ঘোষণায় ডায়াবেটিসকে দীর্ঘমেয়াদি, অবক্ষয়ী ও ব্যয়বহুল ব্যাধি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে যা মানবদেহে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।সঠিক ব্যবস্থা নিলে এই রোগকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই এ রোগের সুচিকিৎসার জন্য ডায়াবেটিস সম্পর্কে রোগীর যেমন শিক্ষা প্রয়োজন, তেমনি রোগীর নিকটাত্মীয়দেরও এই রোগ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা দরকার। কারণ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

2 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন