ভীতি কিংবা ফোবিয়া কেন? ফোবিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ( Why fear or phobia? Details about phobias )

লিফট এর ভিতর দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ চলে গেল বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় লিফট এর ভিতর অন্ধকার হয়ে গেছে। লিফট এর ভিতর আপনার পাশের মানুষটি স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু আপনি পারছেন না স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে। ক্রমশই ভয়ে কাতর হয়ে যাচ্ছেন। আপনি এতটাই ভয়ে আছেন যে, আপনার মনে হচ্ছে আপনি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবেন যেকোন সময় । এইযে একটা ভয় অর্থাৎ আপনার এই মানসিক অবস্থাকে অন্ধকারভীতি  (অ্যাক্লুও ফোবিয়া) বলে। 

যেকোন ধরনের ফোবিয়া হচ্ছে একধরনের মানসিক অবস্থা। অতি অল্প পরিমান/সামান্য পরিমান বিষয়েও কারো ফোবিয়া (ভীতি) থাকতে পারে। 


জন্মগতভাবে ফোবিয়া কারোর ভিতর থাকে না। কোন বিষয়ে যদি অতিরিক্ত ভয় পাওয়া হয় তাহলে তার পেছনে অতীতের কোন ঘটনা যুক্ত থাকতে পারে। মানুষ যেই জিনিসকে ভয় পায়, অতীতের সেই ঘটনা তার সাথে মিলিয়ে সে এক মানসিক যন্ত্রণার ভিতর পড়ে। আর সেই মানসিক যন্ত্রণা থেকে যে আতঙ্ক তৈরী হয় তাকে আমরা বলি ফোবিয়া। অনেক সময় আবার ফোবিয়া অন্যান্য রোগের উপসর্গও হতে পারে । 

বিশেষজ্ঞরা ফোবিয়ার ৩টি ধরন নিয়ে আলোচনা করেন। 

১. অ্যাগ্রোফোবিয়া

২. সোশ্যাল ফোবিয়া

৩. স্পেসিফিক ফোবিয়া


অ্যাগ্রোফোবিয়া

যেসকল মানুষেরা অ্যাগ্রোফোবিয়াতে আক্রান্ত তারা খোলা জায়গায় যেতে ভয় পায়। যদি কোন সমস্যার ভিতর পড়ে তাহলে সেই সকল মানুষ ভয় পেয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারেন না। মূলত এই ধরনের মানুষ যদি কোন সমস্যার ভিতর পড়েন, তাহলে সমস্যা সমাধান করার চাইতে সেইখান থেকে পালিয়ে আসতে অনেক বেশী পছন্দ করেন। এই ধরনের মানুষ বাসা থেকে বের হতে চান না। দিনের পর দিন এই ধরনের মানুষ বাসা থেকে বের না হয়ে নিজেদের রুমে বন্দী করে রাখেন। এর থেকে বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন) তৈরী হতে পারে । 

সুনির্দিষ্ট জিনিসের ওপর ভীতি

কোন নির্দিষ্ট জায়গা, বস্তু বা পরিস্থিতিকে অতিরিক্ত মাত্রায় ভয় পেলে তাকে সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপর ভীতি (স্পেসিফিক ফোবিয়া হিসাবে দেখা হয়। এ ধরনের সমস্যার মধ্যে পশু–পাখিকে ভয় পাওয়া, অন্ধকার ভয় পাওয়া, উচ্চতাভীতি, ইনজেকশনভীতির মতো বিষয়গুলোকে দেখা যায়। 
  • তেলাপোকা ভীতিঃ আপনি পড়ালেখা করছেন এই সময় আপনার কাছে একটি তেলাপোকা উড়ে আসলো, আপনি কী করলেন?  আপনি ভয়ে দিলেন দৌড় অথবা ভয়ে চিৎকার, চেচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুল্লেন৷ যারা পোকামাকড় বা তেলাপোকা দেখে অতিমাত্রায় ভয় পান তাকে বলে এন্টোমোফোবিয়া।  এ ছাড়াও আরোও অনেক ফোবিয়া আছে, যা স্পেসেফিক ফোবিয়ার মধ্যে পড়ে।
  • একাকিত্ব ভীতিঃ একা বা একাকিত্ব হবার ভয়কে বলে মনোফোবিয়া বা অটোফোবিয়া।  বাড়ির মতো একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় জায়গায় তাঁরা একা বোধ করেন। যারা অটোফোবিয়াযতে আক্রান্ত সেই সকল ব্যক্তিরা নিরাপদ বোধ করার জন্য তাঁদের আশপাশে অন্যান্য ব্যক্তির প্রয়োজন বলে মনে করেন। শারীরিকভাবে নিরাপদ বোধ করলেও, মানসিকভাবে তাঁরা ভয়ে থাকেন।
  • পানিভীতিঃ অনেকেই আছেন যারা পুকুর, সমুদ্র অথবা নদীর পানি দেখলেই ভয় পান। পানি দেখে এমন ভয় পাওয়াকে বলে হাইড্রোফোবিয়া। সমুদ্রবিলাসে গিয়েছেন, সবাই পানিতে নামছে মজা করছে অথচ আপনি ভয়ে পানিতে অর্থাৎ সমুদ্রে নামছেন না বা আতংকে পানির সামনেই  যেতে পারছেন না। এসকল ব্যাক্তিদের এমন মনে হয় যে, পানিতে নামলে ডুবে যাবেন বা আর ফিরে আসতে পারবেন না। 
  • রক্তভীতিঃ সবজি কাটতে গিয়েছেন এমন সময় হাত সামান্য কেটে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। আর সেই রক্ত দেখে অনেকেই আছেন অজ্ঞান হয়ে যান। এটাও এক ধরনের সুনির্দিষ্ট জিনিসের উপর ভীতি। রক্ত দেখে যাঁরা ভয় পান, তাঁরা হিমোফোবিয়ায় ভুগছেন। এ ধরনের লোকজনের রক্ত দেখার সঙ্গে সঙ্গে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয় আর  সেখান থেকে প্যানিক অ্যাটাক হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। 
  • উচ্চতাভীতিঃ ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন এমন সময় যদি নিচে তাকানো হয় তাহলে মনে হয় যে পড়ে যাবো। আমরা অনেকেই ভয় পায় উচু জায়গাকে। বিশেষত সেখানে যদি পড়ে যাবার আশঙ্কা থাকে অথবা নিরাপত্তা কম থাকে। এটা সবার ক্ষেত্রেই হয়। তবে কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ভয় প্রকট আকার ধারন করে। এতটাই মারাত্মক আকার ধারন করে যে, যেকোন সময় বিপদ ঘটে যেতে পারে। প্রবল উচ্চতাভীতি আছে, এমন ব্যক্তি যদি কোনো কারণে অতিরিক্ত উচ্চতায় উঠে গেলে তাঁদের প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদি দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া না হয় তাহলে অতিরিক্ত অস্থিরতায় তাঁরা অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন।

সামাজিক ভীতি

লোকজন যেখানে, সেখানেই আস্বস্তি। সেখানেই ভয় বেশী। সংকোচবোধ করা মানুষের সাথে কথা বলতে। জনসমাবেশ এড়িয়ে যেতে চলতে থাকেন অনেকেই ভয় পেয়ে। এই ধরনের মানুষ যদি কোথাও যান তাহলে তারা মনে মনে ভাবেন কেউ তাকে পর্যবেক্ষণ করছে সব সময়। তার নিয়ে সমালোচনা বা তার দিকে তাকিয়ে আছেন সব সময়। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে কারো সাথে কথা বলতে  গেলে৷ এই ধরনের লোক জন মানুসিক ভাবে খুবই অস্বস্তিতে আছেন বা থাকেন৷  আর তাদের এই ভীতি মূলত দেখা হয়  সোশ্যাল ফোবিয়া (সামাজিক ভীতি) হিসাবে। যা মূলত প্রকাশ পায় শারীরিক কিছু উপসর্গের মধ্য দিয়ে৷ এর মধ্যে আছে বমিবমি ভাব, মাথাঘোরা, পেটের মধ্যে অস্বস্তিবোধ, অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া,  মাথা ঝিমঝিম করা, হাত-পা কাঁপা, মুখ শুকিয়ে আসা, বুকে চাপ অনুভব,  ব্যথা, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট, দমবন্ধ ভাব ইত্যাদি।

1 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন